“ইসলাম না ইনসাফ?” — ফরায়েজী সাহেবের পোস্ট কি জুলুমকেও বৈধ করে?


"ইসলামের মাঝে ইনসাফ আছে, কিন্তু ইনসাফের মাঝে ইসলাম জরুরি নয়"—এই বক্তব্যটি সাম্প্রতিক সময়ে চিন্তাশীল মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মোহতারাম মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী সাহেবের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক সামনে আসে। কেউ এটিকে ইসলামের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন—এই বক্তব্যের কিছু ব্যাখ্যা সমাজ ও রাজনীতিতে বিভ্রান্তিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এই লেখার উদ্দেশ্য ব্যক্তি নয়; বরং বক্তব্য, তার প্রেক্ষাপট এবং সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ পেশ করা।

মুফতি লুৎফর রহমান ফরায়েজী সাহেব এর পোস্ট 


প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ইসলাম নিঃসন্দেহে ইনসাফের চেয়েও বড় একটি সত্য। ইসলাম কেবল ন্যায়বিচারের কিছু নিয়ম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আকীদা, ইবাদত, আখলাক, পারিবারিক বিধান, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আখিরাত—সবকিছু মিলেই ইসলামের কাঠামো গঠিত। এই অর্থে বলা যায়, একজন মুমিন কেবল ন্যায়বিচার পেলেই সন্তুষ্ট হতে পারে না; সে চায় আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী জীবন পরিচালিত হোক। যদি ফরায়েজী সাহেবের বক্তব্যের উদ্দেশ্য হয় এই বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা—তাহলে তা একটি দৃঢ় ঈমানী অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হবে।


তবে সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন এই কথার এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয় যে—ইনসাফ যদি ইসলামের নাম, স্লোগান বা কাঠামোর ভেতরে না আসে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন অমুসলিম রাষ্ট্রে কিছু ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থা কার্যকর, দুর্নীতি তুলনামূলকভাবে কম এবং নাগরিক অধিকার আংশিকভাবে হলেও রক্ষিত। এসব রাষ্ট্র ইসলামী রাষ্ট্র নয়—এটি সত্য। কিন্তু সেখানে যে সীমিত পরিসরে ইনসাফ বিদ্যমান, তা কি সম্পূর্ণ অস্বীকার করা ইসলামের দাবি? ইসলাম কখনোই ন্যায়বিচারকে কেবল মুসলমানদের একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে দেখেনি।


কুরআনে বারবার ইনসাফ কায়েমের নির্দেশ এসেছে। এমনকি শত্রু বা বিরোধীদের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না হওয়ার হুকুম দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো—ইনসাফ একটি সার্বজনীন মূল্যবোধ, যা ইসলাম আরও পরিপূর্ণ ও নৈতিক উচ্চতায় উন্নীত করেছে। সুতরাং ইসলাম বনাম ইনসাফ—এই দ্বন্দ্বটি মূলত কৃত্রিম। বাস্তবে ইসলাম কখনো ইনসাফের বিপরীতে দাঁড়ায় না; বরং ইসলাম ইনসাফকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয় এবং জুলুম থেকে রক্ষা করে।


এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক বাস্তবতা। বর্তমানে কিছু মহলে এমন ধারণা ছড়ানো হচ্ছে যে—যারা সরাসরি “শরিয়া রাষ্ট্র” বা “ইসলামী সংবিধান” বাস্তবায়নের স্লোগান তোলে না, তাদের সমর্থন করা বা ভোট দেওয়া নাজায়েয। যদিও তারা মুসলমানদের অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করার দাবি করে। এই ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গভীর ফিকহি বিশ্লেষণ ছাড়া দেওয়া উচিত নয়। কারণ এখানে শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব ফলাফল ও পরিণতির প্রশ্ন জড়িত।


বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোট কোনো আকীদার বিষয় নয়; বরং এটি একটি মাধ্যম বা কৌশল (وسيلة)। ফিকহের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—মাধ্যমের হুকুম উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে। যদি কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুসলমানরা কিছু কল্যাণ, কিছু ইনসাফ এবং কিছু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটিকে সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নাজায়েয ঘোষণা করা সহজ বিষয় নয়। এখানে ফিকহুল মাওয়াজানাত—অর্থাৎ লাভ ও ক্ষতির তুলনামূলক বিচার—এবং ফিকহুল মাআলাত—অর্থাৎ ভবিষ্যৎ পরিণতি বিবেচনা—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মুসলমানরা সব যুগে ও সব পরিস্থিতিতে একই কৌশল অবলম্বন করেনি। কখনো তারা পূর্ণ ক্ষমতায় ছিল, কখনো সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করেছে, কখনো চুক্তি ও সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য ছিল—যতটুকু সম্ভব ইনসাফ কায়েম করা এবং জুলুম কমানো। অতএব, এমন কোনো বক্তব্য বা স্লোগান যা পরোক্ষভাবে জুলুমকে বৈধতা দেয় বা ইনসাফকে তুচ্ছ করে, তা ইসলামের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।


আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্ব দিয়ে বলা দরকার। ইসলামের নামে আবেগী স্লোগান তোলা যতটা সহজ, ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক চেতনা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা ততটাই কঠিন। শুধু “ইসলাম চাই” বলা যথেষ্ট নয়; প্রশ্ন হলো—কোন ইসলাম, কোন ব্যাখ্যা এবং কোন বাস্তবতার আলোকে? যদি ইসলামের নাম ব্যবহার করে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বা জুলুমকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তাহলে তা ইসলামের বিজয় নয়; বরং ইসলামের অপব্যবহার।


আমাদের অবস্থান তাই হওয়া উচিত স্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল। কুফর ও ইসলামের মুখোমুখি অবস্থানে আমরা নিঃসন্দেহে ইসলামের পক্ষেই থাকব—এতে কোনো আপস নেই। কিন্তু ইনসাফ বনাম জুলুমের প্রশ্নে ইসলাম সবসময় ইনসাফের পাশেই দাঁড়ায়। ইসলামের নামে যদি জুলুমকে সমর্থ

ন করা হয়, তবে তা ইসলামকে শক্তিশালী করে না; বরং সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।


উপসংহারে বলা যায়, ফরায়েজী সাহেবের বক্তব্যের একটি ঈমানী ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা যেমন সম্ভব, তেমনি এর কিছু ভুল বা অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা সমাজের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই আবেগ নয়, জ্ঞান; স্লোগান নয়, ফিকহি ভারসাম্য; এবং দলীয় পক্ষপাত নয়—বরং কুরআন, সুন্নাহ ও বাস্তবতার আলোকে অবস্থান নির্ধারণ করাই উম্মাহর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কল্যাণকর পথ।

প্রশ্ন–উত্তর (ফ্যাক্ট ও বিশ্লেষণ)

❓ ইসলাম কি কেবল ইনসাফেই সীমাবদ্ধ?

উত্তর: না। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইনসাফ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও ইসলাম কেবল ন্যায়বিচারেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে আকীদা, ইবাদত, আখলাক, শরিয়া ও আখিরাত—সবই অন্তর্ভুক্ত।

❓ “ইসলামের মাঝে ইনসাফ আছে, কিন্তু ইনসাফের মাঝে ইসলাম নেই”—এই কথা কি মূলত ভুল?

উত্তর: বক্তব্যটি পুরোপুরি ভুল নয়, তবে ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল। ইসলামের পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে বলা হলে তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যদি এর দ্বারা ইনসাফকেই তুচ্ছ করা হয়, তাহলে তা সমস্যাজনক হয়ে দাঁড়ায়।

❓ ইসলাম কি অমুসলিম সমাজে বিদ্যমান ইনসাফ স্বীকার করে?

উত্তর: হ্যাঁ। ইসলাম কখনোই বলেনি যে ইনসাফ কেবল মুসলমানদের মাঝেই থাকবে। বরং যেখানেই ন্যায়বিচার আছে, তা স্বীকার করা ইসলামের পরিপন্থী নয়।

❓ ইনসাফ বনাম ইসলাম—এই দ্বন্দ্ব কি বাস্তব?

উত্তর: না। এটি একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব। বাস্তবে ইসলাম কখনো ইনসাফের বিরোধী নয়; বরং ইসলাম ইনসাফকে আরও পরিপূর্ণ ও নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে।

❓ বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোট কি আকীদার বিষয়?

উত্তর: না। ভোট একটি মাধ্যম (وسيلة), আকীদা নয়। ফিকহের দৃষ্টিতে মাধ্যমের হুকুম উদ্দেশ্য ও পরিণতির উপর নির্ভর করে।

❓ যারা সরাসরি শরিয়া রাষ্ট্রের স্লোগান তোলে না, তাদের ভোট দেওয়া কি নাজায়েয?

উত্তর: এটি একটি গভীর ফিকহি প্রশ্ন। একে সাধারণভাবে নাজায়েয বলার আগে বাস্তবতা, লাভ–ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ পরিণতি বিবেচনা করা জরুরি।

❓ ইসলামের নামে ইনসাফ অস্বীকার করা কি সঠিক?

উত্তর: না। ইসলামের নামে ইনসাফ অস্বীকার করা হলে তা ইসলামের চেতনার বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম জুলুমের পক্ষে কখনোই অবস্থান নেয় না।

❓ তাহলে একজন মুসলিমের সঠিক অবস্থান কী হওয়া উচিত?

উত্তর: ইসলামের পক্ষে দৃঢ় থাকা, ইনসাফকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মানা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়াই একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব।

❓ এই আলোচনার মূল শিক্ষা কী?

উত্তর: আবেগ বা স্লোগানের চেয়ে কুরআন–সুন্নাহ, ফিকহি ভারসাম্য ও বাস্তবতার আলোকে চিন্তা করাই উম্মাহর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কল্যাণকর পথ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ